বরিশাল নগরীতে ছয়মাসেও ঢাকনা পায়নি সড়কের ম্যানহোল গুলো

বরিশাল ব্যুরো।

বরিশাল নগরীতে সড়কের বিভিন্ন ওয়ার্ডগুলোতে ম্যানহোল ঢাকনা নেই বললেই চলে সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বে প্রকৌশলীরা থাকলেও এর কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না অভিযোগ করেন নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা তারা বলেন রাতের বেলায় পথচারীদের হাঁটতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কেননা যদি কোন পথচারী অথবা সাধারণ মানুষ এই ম্যানহোলে এর ভিতর পড়ে যায় তাহলে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা নগরীর হাতেম আলী কলেজ থেকে বটতলা পর্যন্ত ১০-১৫ টি ঢাকনা থাকলে ও বাকিগুলো নেই এমনটাই অভিযোগ করেন মোজাম্মেল নামে একজন বাসিন্দা তিনি বলেন, শুধু এই ওয়ার্ডেই নয় নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সড়কগুলোতে এরকমের চিত্র দেখা যায়। এরকমের সবকিছুতেই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের দাবী করা বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি বা বসিক) পুনরায় একবছরের জন্য হাটবাজার ও বাস টার্মিনাল ইজারা দিতে দরপত্র আহ্বান করেছে। সাথে রয়েছে তিনবছর মেয়াদি পুকুরের ইজারা। একইসাথে উপজেলা প্রশাসনও জলমহাল এবং হাটবাজার ইজারা দেওয়ার জন্য আজ দরপত্র যাচাই-বাছাই করছে বলে জানা গেছে। বরিশাল সদর উপজেলার টেন্ডার পক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানা না গেলেও এ নিয়ে রীতিমতো স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান জানিয়েছেন বসিক কর্তৃপক্ষ। ইতিপূর্বে তারা নগরীর চৌমাথা বাজারে ভবন তুলে তা নিলামে চড়িয়ে ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর সমালোচনার মুখে পরেছে। এ নিয়ে হয়েছে সড়ক অবরোধ সহ প্রতিবাদ সমাবেশ। কোনোরকম জনসম্পৃক্ততা এবং নগর উন্নয়নে কোনো ভূমিকা ছাড়াই তাদের এসব কার্যক্রমের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বরিশালের নাগরিক আন্দোলনসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
১৩ ফেব্রুয়ারী বৃহস্পতিবার বিভিন্ন স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ইজারার বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে – বরিশাল সিটি কর্পোরেশন বসিক এর নিয়ন্ত্রণাধীন নিম্ন বর্ণিত ১৫ টি হাটবাজার, ০২ টি বাস টার্মিনাল, ০৩ টি পাবলিক টয়লেট ও ০১ টি জবাইখানা ১৪৩২ বঙ্গাব্দের (১লা বৈশাখ থেকে ৩০ শে চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ১ বছরের) জন্য এবং ০৫ টি পুকুর ৩ বছরের জন্য (১৪৩২ বঙ্গাব্দের ১ লা বৈশাখ থেকে ১৪৩৪ সালের ৩০ শে চৈত্র) পর্যন্ত ইজারা প্রদানের নিমিত্তে ইজারা গ্রহণে ইচ্ছুক ব্যক্তিগণের নিকট হতে নির্ধারিত ফরমে (বিস্তারিত শর্তাবলি সিডিউলে দেখা যাবে) সীলমোহরযুক্ত দরপত্র আহবান করা যাচ্ছে।।
বিজ্ঞাপনের শুরুতে ১৫টি হাটবাজার দাবী করলেও তালিকায় ১৬টি লিখে ১৫টি বাজারেরই তালিকা দেয়া হয়েছে। এটি নতুন আর একটি বাজার তৈরি করে তা বৈধ করার ষড়যন্ত্র বলে দাবী নাগরিক আন্দোলনের। তারা বলেন, ১৫ টি হাটবাজারের মধ্যে
পুরান বাজার, নতুন বাজার, সাগরদী বাজার, বাংলা বাজার, বটতলা বাজার, কাশিপুর বাজার, কালিজিরা বাজার, বরিশাল জেলা মৎস্য পাইকারী বাজার,
রুপাতলী বাজার (হাউজিং সংলগ্ন), চৌমাথা বাজার, কলাডেমা হাট, জাগুয়া হাট, বরিশাল হাট বা হাটখোলা, বাঘিয়া গরুর হাট এবং কাউনিয়া বাঁশের হাট রয়েছে। দুটি বাস টার্মিনালের একটি নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও অন্যটি রূপাতলী বাস টার্মিনাল। আর ৩টি পাবলিক টয়লেট হচ্ছে, নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল পুরাতন পাবলিক টয়লেট,
রুপাতলী বাস টার্মিনাল পাবলিক টয়লেট, ষ্টীমার ঘাট পাবলিক টয়লেট, জবাইখানা- ০১ টি
জবাইখানা (যে সকল বাজারে পশু জবাই করা হয়)। এগুলো সবই একবছর মেয়াদি অর্থাৎ আসছে বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত। অন্যদিকে তিন বছর মেয়াদি ৫টি পুকুরের জন্য আসছে বৈশাখ থেকে পরবর্তী চৈত্র ১৪৩৪ পর্যন্ত। এ তালিকায় আছে সদর রোডস্থ বিবির পুকুর, ফকির বাড়ী রোডস্থ রাখাল বাবুর পুকুর, কাটপট্টি রোডস্থ থানা সংলগ্ন পুকুর, আমির কুটির হরিজন পুকুর, আমানতগঞ্জ শহীদ শুক্কুর পার্ক পুকুর
১,২০,০০০/- টাকা সরকারি ইজারা মূল্য ধরা হয়েছে। যার দরপত্র মূল্য অফেরতযোগ্য ১০০০/-। এরমধ্যে সবচেয়ে চড়া মূল্য দুটি বাস টার্মিনাল এবং একটি বাজারের। যার সরকারি মূল্য (সর্বনিম্ন ইজারা মূল্য) বরিশাল জেলা মৎস্য পাইকারী বাজার প্রায় সাড়ে দশ লক্ষ, নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল প্রায় এগারো লক্ষ এবং রূপাতলী বাস টার্মিনাল প্রায় ২০ লক্ষ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারী বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিইও রেজাউল বারী সাক্ষরিত এই বিজ্ঞাপনে পুকুর বাদে বাকী সব ইজারা এক বছরের জন্য অর্থাৎ আগামী বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত মেয়াদ উল্লেখ করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন তার আওতাধীন বাজার বা বাস টার্মিনাল, পুকুর ইজারা দেবে এটাই স্বাভাবিক। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনো আপত্তি থাকার কথা নয় দাবী করে নাগরিক আন্দোলন নেতৃবৃন্দ বলেন, যেহেতু সিটি করপোরেশনের কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই, তাই বিভাগীয় কমিশনারকে এর প্রশাসক করা হয়েছে এবং একজন নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে এই প্রশাসক আগামী নির্বাচন পর্যন্ত জনগণের সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু বরিশালে দায়িত্বরত সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও সিইও কি জনগণের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো ভূমিকা পালন করেছেন? সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যা আজ পর্যন্ত সমাধান হয়নি। চৌমাথা বাজারের দোকান বরাদ্দ নিয়ে এই প্রশাসন ব্যস্ত ছিলেন। ভবন নির্মাণ প্ল্যান অনুমোদন সংক্রান্ত জটিলতা ও হয়রানি নিয়ে আন্দোলনরতদের উপর হামলার হয়েছে। আমরাতো দেখছি এই প্রশাসন ইচ্ছেকৃত ভাবে স্থানীয় সরকার বিভাগকে বদনাম করতে উঠে পরে লেগেছে। জনসাধারণের ভোগান্তি দূর করতে কোনো ভূমিকা বা আগ্রহ না থাকলেও সিটি করপোরেশনের আয় বৃদ্ধি সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে তাদের আগ্রহ সন্দেহজনক বলে জানান বরিশাল নাগরিক আন্দোলন নেতৃবৃন্দ। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং সাবেক মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, এই প্রশাসন নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ নিয়ে আমরাও একাধিকবার বলার পরও নগরীর উন্নয়নে তারা কোনো পদক্ষেপ আজ পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারেনি। অথচ আজই পত্রিকায় দেখেছি তাদের ইজারা বাণিজ্য শুরু হয়েছে। জনগণের অংশগ্রহণ এবং সম্মতি ছাড়া এসব পদক্ষেপ তারা নিতে পারেনা বলে জানান বরিশালের এই সাবেক মেয়র।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ বরিশাল ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী বলেন, এই প্রশাসনেরতো কোনো জনসম্পৃক্ততা নেই। তারা সবকিছুতে মাস্টারপ্ল্যানের দোহাই দিচ্ছেন অথচ জনসম্পৃক্ততা ছাড়া কোন প্ল্যানই বাস্তবায়ন সম্ভব না। মাস্টারপ্ল্যানের মধ্যে শহরের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষদের নিয়ে সিটি কাউন্সিল গঠনের কথা উল্লেখ আছে। সেটা না করে কোন পরিকল্পনাই সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব না। তারা যা করছে তা স্বেচ্ছাচারিতা এবং সরকারের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে। গত ছয় মাসে তারা একটি ম্যানহোলে ঢাকনা দিতে পারে নাই, ইসলাম পাড়াসহ নগরীর অসংখ্য সড়ক ব্যবহার অনুপযোগী পরে আছে বলে জানান ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী।
বরিশাল নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব প্রকৌশলী আবু সালেহ বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর বিভাগীয় কমিশনার সিটি করপোরেশনের প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু বরিশালের প্রশাসক প্রথম থেকেই বাণিজ্যিক বিষয়ে গুরুত্ব দিলেও নগরীর উন্নয়নে তার কোনো আগ্রহ আমাদের চোখে পড়েনি। বরং মাস্টারপ্ল্যানের দোহাই দিয়ে নগরী তথা সিটি করপোরেশনের আয়ের বড় একটা উৎস প্লানিং অনুমোদন বন্ধ রেখেছেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রায়হান কাওছার বললেন, আমি বিষয়টি দেখবো এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।