বরিশালে মৎস্য আড়তদার সমিতির নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা 

বিশেষ প্রতিবেদক

বরিশাল সদর থানা মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। আগামী ৪ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচন ঘিরে হুমকি-ধামকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করার অভিযোগে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একাধিক প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোর ঘটনায় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে ভোটার ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার রেজাউল করিম বাচ্চু তালুকদার ও সহকারী কমিশনার খাজা মো. ইকবালসহ ছয় সদস্যের একটি কমিটি নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করছেন। একাধিক ব্যবসায়ী ও ভোটারের দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার রেজাউল করিম বাচ্চু তালুকদার এবং সহকারী কমিশনার খাজা মো. ইকবাল বিএনপি-সমর্থিত হিসেবে পরিচিত। তবে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার রেজাউল করিম বাচ্চু তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১১টি পদের বিপরীতে মোট ২০টি মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছিল। এর মধ্যে ১৮ জুন রাত পর্যন্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদসহ ৮ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন এবং দুটি মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।

সহকারী নির্বাচন কমিশনার খাজা মো. ইকবাল জানান, সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন কামাল সিকদার, জামাল হোসেন ও খান কামাল হোসেন। এর মধ্যে কামাল সিকদার ও জামাল হোসেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। যুগ্ম সম্পাদক পদে মনোনয়নপত্র কেনা শাহীন কলিও প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। তাদের কয়েকজনের অভিযোগ, প্রতিপক্ষের চাপ ও ভয়ভীতির কারণে তারা নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

এদিকে পোর্ট রোডের প্রবীণ ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েও মনোনয়ন প্রত্যাহার করায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ। জীবনের বাকি সময় সম্মান নিয়ে কাটাতে চাই। নির্বাচনে অংশ নিলে সম্মানহানির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেছি। তাই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছি।”

তবে তার একাধিক সমর্থক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ভোটারদের একটি অংশের অভিযোগ, এটি স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নয়; তাকে বিভিন্ন ধরনের চাপ ও হুমকির মুখে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। মনোনয়ন প্রত্যাহারের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে অর্ধশতাধিক ভোটার তার কাছে কারণ জানতে চান বলেও জানা গেছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে সভাপতি পদপ্রার্থী ও আড়তদার সমিতির অন্যতম সদস্য জহির সিকদার নির্বাচনকে ঘিরে নানা অভিযোগের বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আগামী ৪ জুলাই নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও একটি পক্ষ এ নির্বাচন বানচাল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে ৮ জন মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। আমরা একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই, যেখানে শুধু প্রকৃত মাছ ব্যবসায়ীরা অংশ নেবে। বহিরাগত কোনো হস্তক্ষেপ এখানে আমরা চাই না।”

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পোর্ট রোড মৎস্য আড়ত এলাকায় প্রচারণাও জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন প্রার্থীর ব্যানার ও পোস্টার দেখা গেলেও সবচেয়ে বেশি প্রচারণা সামগ্রী চোখে পড়ছে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী খান কামাল হোসেনের। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, তিনি আওয়ামী লীগ নেতা খান হাবিবের ভাই। তবে এ বিষয়ে খান কামাল হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মোট ১৬০ জন ভোটারের মধ্যে অনেকের দাবি, দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে আড়তের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের সমর্থকদের প্রভাব ছিল। ভোটারদের একটি অংশের অভিযোগ, বর্তমান নির্বাচনেও সেই প্রভাবকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের তৎপরতা চলছে এবং নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহারকারীদের বাইরে আরও কয়েকজন আবেদন করেছেন। এছাড়া কোনো কোনো প্রার্থী যে পদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন, পরে ভিন্ন পদে মনোনয়ন জমা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এসব বিষয় পর্যালোচনা করে নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ আছে কি না, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বরিশালের বৃহত্তম পাইকারি মৎস্য আড়তের এই নির্বাচন ব্যবসায়ী সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোট ১৬০ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। তাদের মতে, ব্যবসায়িক সংগঠনের নির্বাচন কোনো রাজনৈতিক প্রভাব, পেশিশক্তি বা ভয়ভীতির প্রদর্শনের ক্ষেত্র হতে পারে না। সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।